কলম পাতুরি

ভাবনা আপনার প্রকাশ করবো আমরা

Home » পুজো সংখ্যা ১৪২৮ » খিচুড়ির ইতিবৃত্ত

খিচুড়ির ইতিবৃত্ত

খিচুড়ির ইতিবৃত্ত প্রবন্ধ – রুদ্র সোম

এতকিছু থাকতে খিচুড়ি কেন?
বাড়ির পাশে কত কন্টিনেন্টাল আউটলেটস। KFC, MCDONALDS, MIO AMORE, CCD , তবে কি আমরা এখন পিছিয়ে যাচ্ছি?
না, কারণ খিচুড়ি কোন খাবারের নাম নয় একটা সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত। এই ডিস কোনকালে পুরোনো হবে না। চিরদিনের খাবার । যার শিকড় সন্ধানী করা রীতিমত গবেষনা ধর্মী কাজ।

ভারতবর্ষের এমন কোনো মানুষ নেই যে খিচুড়ি খাইনি বা তার নাম শোনে নি শুধু ভারতবর্ষেই নয় ভারত উপমহাদেশের ক্ষেত্রে এই কথাটি অতিব সত্য।
আসুন, আজ খিচুড়ি নিয়ে কিছু বলি।
ভারতেই খিচুড়ির নাম বিভিন্ন জায়গায় নাম ভিন্ন ভিন্ন ,তবে কোথাও বর্ণ লোপ বা কোথাও বর্ণ বিপত্তি ঘটেছে ..দেখা যাক ..কি কি নাম
বঙ্গ দেশে খিচুড়ি, খিচারি, কিসুরি।
ওড়িশায় খেচিরি কোথায়ও খীচরি। আবার খিসডী,
দক্ষিণ ভারতে খিঁচডি বা খিকরি ইত্যাদি নামে খিচুড়ি বর্তমান ।

খিচুড়ি শব্দ এলো কোথা থেকে ?. সংস্কৃত শব্দ :- খিচ্ছ: বা খিচ্ছা থেকে খিচুড়ি শব্দটি এসেছে । শুধুই ভারত নয় সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে এইখাবারের জুড়ি মেলা ভার।
ভারতের বহু প্রাচীণ যুগ থেকে খিচুড়ি অতি জনপ্রিয়। যুগ যুগ ধরে যারাই ভারতে এসেছে তারাই এই খাবার আপন করে নিয়েছে। মধ্যযুগে ভারতের মুঘলরা খিচুড়ির প্রেমে বিভোর ছিল।আইন ই আকবরি গ্রন্থেও খিচুড়ির উল্লেখ আছে। শোনা যায় যে মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর খিচুড়ি কে আপন খাবারের তালিকায় রাখতেন।
প্রাচীন ভারতের চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের আমলেও খিচুড়ির নাম পাওয়া যায় । অর্থনীতিবিদঃ চাণক্য শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব করেননি তিনি খাবার নিয়েও যথেষ্ট মাথা ঘামিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে খিচুড়ি একটি সুষম আহার।
শুধু ভারত নয় সমগ্র দক্ষিণপূর্ব এশীয় মায় পাকিস্থান আফগানিস্তান ও ইরান উজবেকিস্তান, কাজাঘিস্থান জুড়ে এই খাবারের বিস্তার ছিল ও আজও আছে।

খিচুড়ি আজ ভারতের খাবারের রানী। 2017 সাল থেকে এই তকমা পেয়েছে আমাদের সাধের খিচুরী।

শোনা যায় গ্রিস দূত সেলুকাস এই খাবারের পরম ভক্ত হয়ে পড়েন। তিনি এই খাবারের রেসিপিও লিখেনেন। ভারত ভ্রমন গ্রন্থে তিনি লিখেছেন যে ভারতের প্রায় সব জায়গায় একটা বিশেষ রকম খাবার সবার প্রিয়। আমির থেকে ফকির সাধু সবাই এই খাবার দুই বেলা খায় আর এটার বিশেষ গুণ যে এটি স্বাস্থ্য কর ও মুখরোচক। তিনি আরো বলেন যে বিভিন্ন প্রকার চাল আর ডালের মিশ্রণ দিয়ে আর দেশীয় নানান মশলা দিয়ে এটা রান্না করা হতো।

বঙ্গের খিচুড়ি প্রেম।

ভাগ্যহত বাঙ্গালীর খাবারের ভাগ্যাকাশে অতি ভোগ্যপণ্য তথা পথ্য হলো খিঁচুড়ি।
সেই খিচুড়ীই আজ ভারতের জাতীয় খাবার।
এই জাতীয় খাবার হবার মুলে ভেতো বাঙ্গালীর তো সিকি শতাংশ তো অবদান আছে।
কেন…?
কেন আবার কি ! ভারত উপমহাদেশে সর্বত্র খিচুড়ী বহু জনপ্রিয় খাবার হলেও বাঙ্গালার নাম আগে আসবে। কারণ বাঙ্গালীদের হাতে এসে খিচুড়ির ভিন্ন ভিন্ন রূপ রস গন্ধ নিয়ে খিচুড়ী নিজেকে বৃহৎ থেকে বৃহত্তর রূপে হাজির করেছে । একমাত্র খাদ্যে যা ব্রেকফাস্ট, টিফিন ,লাঞ্চ ও ডিনার সবকিছুতেই অবারিত প্রবেশ।
জয় হোক বাঙালির রান্না ঘরের। আর জয়ী তো আমাদের ঠাকুমা, মা,কাকীমারাই।

খিচুড়ি রান্না করার আগে ডাল-চালের মিশ্রণকে ভালভাবে ধুয়ে, তেলে পিঁয়াজকুচি, লবণ ও আদা মসলার সাথে ভেজে নিয়ে এরপরে পরিমাণমত জল দিয়ে ভাত-এর মতো রান্না করতে হয়। অনেকে না-ভেজে একসঙ্গে চাল, ডাল, তেল, লবণ, মসলা খিচুড়ি বসিয়ে দেন- একে বলে বলকে রান্না । এটা বাঙালির নিজস্ব একটা দারুন পদ্ধতি।

খিচুড়িতে চাল-ডালের সাথে বিভিন্ন সব্জী-সহ রান্না তৈরি করলে হয়ে যায় সব্জী খিচুড়ি।

খিচুড়ি বাঙালিদের অতি জনপ্রিয় খাদ্য। শুধু তাই ই নয় ভারতের তেত্রিশ কোটি দেব দেবীকেও খিচুড়ির অভ্যাস করে ছেড়েছে এই ভেতো বাঙালিরাই।
যে সব দেবদেবীরা ভারতের অন্য রাজ্যে শুকনো নারকেল আর বাসি মুড়ি খেয়ে পেটে চরা পড়ে গেছে সেই ঈশ্বর ঈশ্বরীরাই বঙ্গে এসে দিব্যি খিচুড়ি খেয়ে অতি সন্তুষ্ট।

খিচুড়ির কত রূপে বিভক্ত হয়ে হাজির হয় আমাদের জীবনে তার ইয়াত্তা নেই।
খিচুড়ি সর্ব রূপে ভিন্ন ভিন্ন গন্ধে মাধুর্যে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে তার মহিমা হাজির করে।
খিচুড়ি বাঙ্গালীর ঠাকুরের প্রসাদ আবার সেই খিচুড়িই বাঙ্গালীর রুগীর পথ্য । আবার অন্য রূপে এই খিঁচুরিই ঠাকুমা, মা মাসিদের উপবাস ভাঙার আহার।
খিচুড়ি বাঙ্গালী বাচ্চার প্রথম solid food , এই খিচুড়িই আবার বালক বেলায় প্রথম পিকনিক এর একমাত্র মেনু ।

বাঙালির গায়ে জ্বর, তখন হাজির সাবুর খিঁচুরি। ঠাকুমার একাদশী তো খিচুড়ি হাজির নাম ডালিয়ার খিচুড়ি ।

একাদশী বা গৃহপূজা বা লক্ষীদেবী, সরস্বতী পুজোয় তো পেট পূজিত হয় খিচুড়ির মধ্য দিয়েই।




আর গব্যঘৃত সহযোগে নিরামিষ খিচুড়ীর অপূর্ব স্বাদ তো বাঙ্গালীরাই যোজন দূরে গন্ধ ছাড়িয়ে নিজে আত্মশ্লাঘা বোধ করত। আহা, এর অপরনাম যোজনগন্ধা হওয়া উচিত ছিল।
পাড়ায় বালক ভোজনে শালপাতায় গড়িয়ে যাওয়া খিচুড়ির অনবদ্য স্বাদ কিম্বা লোকনাথ বাবার অনুষ্ঠানে খিচুড়ী সঙ্গে মিক্স ছেঁচড়া …..আহা ..।। কে ভুলিতে পারে তাহা !! কে ভুলিতে পারে!!
বড়ই নস্টালজিক।

সব পার্বন ছাড়াও খিচুড়ি হাজির সর্বক্ষণ। আমরা কখন খিচুড়ি খাই ! বলা ভাল আমরা কখন খিচুড়ি খাই না ?
খোকা কাঁদছে ? কেন ? কিচুই খায় না ?
শাশুড়ি বললো বৌমা আ…”একটূ বাটিতে খিচুড়ি করে দাও ,দেখ্ , বাবুসোনা ঠিক খাবে”।

পেট খারাপ ? হালকা খিচুড়ি । মুখে রুচি নেই ? একটূ মশলা দার খিচুড়ি । গায়ে জ্বর ? খিচুড়ী দাও । বৃষ্টি হচ্ছে ? আজ তো খিচুড়ীর দিন।

কোকিল কণ্ঠী বধূ, কাক্কু কণ্ঠে বলল “কি গো বাজার যাবে না ? পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছো- ? “
…ভাল লাগছে না । ঐ চালে ডালে করে দাও..।

বাড়ির লক্ষ্মীপূজা ? খিচুড়ী আর লাব্রা । বাড়িতে একাদশী ? সেখানেও নিরামিষ খিচুড়ী । দুর্গাপূজার মহাভোগে ? .. মাটির কটুরিরে খিচুড়ি আর টমেটোর চাটনি। বেলুড় মঠের পবিত্র মহাভোগে তো অপূর্ব স্বাদের খিচুড়ী আছেই । আদ্যাপীঠে প্রত্যহ মা কালির মহাভোগে চার হাজার ভক্ত তৃপ্তি করে খিচুড়ি ভোগ খান ।
ইসকন এ শ্রীকৃষ্ণের মহাপ্রসাদ হল খিচুড়ী ।
উত্তর কলকাতায় মূক্তরাম বাবু স্ট্রিট এ অবস্থিত মল্লিক বাড়ির ম্যারবেল প্যালেসের পার্ক থেকে প্রতিদিন 6000 ভিখারীকে খিচুড়ি খাওয়ানো হয় । তাই খিচুড়ি দেবতার অর্ঘ্য থেকে গরীব মানুষের বাঁচার রসদ ।

বর্ষাকালে অবিরাম বৃষ্টি হলে বাঙ্গালীর ঘরে খিচুড়ি হবেই আর সঙ্গে চিরসখী বেগুনি ও পাঁপড়।

শীতকালে মটরশুটির ও ফুলকপি ডুমো ডুমো করে কেটে খিচুড়ীতে ভিন্ন স্বাদ ও বৈচিত্র এনে দেয় । আর বড় বড় করে কাটা আলু উঁকি মারে থালা থেকে,
মায়ের হাতের খিচুড়ির হাঁড়ির দিকে তাকিয়ে কে বলেনি বলুন তো ?..
“মা, একটা আলু আর ফুলকপি দাও তো” ???

#
এখন তো বর্ষার দিনে কলকাতার অফিস পাড়াতে …রাস্তায় পাওয়া যায় এই অমৃত ডিস ।
আমার মনে আছে কলকাতা থাকার সময় বর্ষাকালে রাজ্য সরকারের সেচদপ্তর অফিস কমপ্লেক্স এ খিচুড়ি খাওয়ার জন্য প্রতিদিন যেতাম। দাম ছিল 30 টাকা সঙ্গে পিয়াঁজি, পাঁপড় লাবড়া আর টমেটোর চাটনি। জানি না আজও ফ্রী স্কুল স্ট্রীটে F C I এর অফিস চত্বরে রবি দার সেই দোকান আজও আছে কি না ?

খিচুড়ি বঙ্গের অঙ্গের সঙ্গে জড়িত আর সেই জন্যেই বাংলা ভাষার প্রবাদ প্রবচন এ …”জগা খিচুড়ি” ও পাওয়া যায়।
বঙ্গের খিচুড়িকে সর্বশ্রেষ্ঠ বলা হয় ..তার বিভিন্ন রূপ ও স্বাদের জন্যেই । বৃহত্ বঙ্গে ..সিলেট বা শ্রীভূমির খিচুড়ির স্বাদ নাকি সবচেয়ে বেশি।
সিলেটের বাঙ্গালীরা খিচুড়িকে কিসুরি বলে।
ইলিশ খিচুড়ি, খিচুড়ি পোলাও, শাহী খিচুড়ি, গাওয়া ঘি দিয়ে চপচপে করে খিচুড়ি সঙ্গে শাহী আলুর দম পাওয়া যায় সিলেট, ঢাকা আর কুমিল্লায়। খাওয়ায় পর শীতকালেও শরীরে ঘাম ঝরবে। আর স্বাদ ..! একবার পরখ করে দেখুন।
এই খিচুড়ি বিভিন্ন মাছ ও মশলা দিয়ে তৈরি হয় ও দেশি ঘি আর মিক্স আচঁড় সহযোগে পরিবেশিত হয় ।
সিলেটে লাল লঙ্কা দিয়ে বিভিন্ন শুটকি মাছের ঝরঝরে খিচুড়ি প্রচলন বহু পূর্ব থেকেই। আসাম প্রদেশের বাঙালি খিচুড়ি বলতে ওরা বোঝে চালের সাথে মসুর ডাল আর বিভিন্ন সবজি দিয়ে খিচুড়ি করা। শিলচর কাছাড় উপত্যকায় মাছ সহযোগে তৈরি খিচুড়ি তাদের অত্যন্ত প্রিয় খাবার। চট্টগ্রাম যশোর নোয়াখালী পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় ভুনা খিচুড়ি এবং মাছের তৈরি খিচুড়ি খুবই জনপ্রিয় তবে এইসব খিচুড়িতে প্রচুর পরিমাণে মসলা দেওয়া হয়। কলকাতার ঠাকুর বাড়িতে খিচুড়ির সাথে দই খাওয়ার প্রচলন ছিল। মধ্যযুগের মনসামঙ্গল কাব্যে খিচুড়ির উল্লেখ পাওয়া যায়। ডাবের জল এবং মুগ ডাল দিয়ে খিচুড়ি তৈরি হবার কথা মনসামঙ্গল কাব্যে গ্রন্থিত আছে।

বঙ্গ জীবনে খিচুড়ির মাহাত্ম্য বর্ণনা শেষ হবার নয়। কত নামে সে চোখের সম্মুখে উপস্থিত হয়ে আমাদের মনোরঞ্জন করে। যেমন ভুনা খিচুড়ি, আবার ডিম দিয়ে খিচুড়ি, মাংসর খিচুড়ি, বিভিন্ন সব্জি দিয়ে চিকেনের কুচি দিয়ে আবার কখনো খাশির মাংসর কিমা দিয়ে বা নিরামিষ খিচুড়ি
…ভাবা যায়!!
শুধু একটাই কথাই মনে পড়ে খাবি কি রে পাগলা , গন্ধেই মরে যাবি…!!

#
খিঁচুনি বাংলার সংস্কৃতির সঙ্গে মায় ভারত সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত। ইংরেজরা কলকাতাতে খিচুড়ি খেয়ে তো মহাআনন্দে থাকতো। পড়ে তারাও খিচুড়িকে ঢুকিয়ে দিল ব্রিটিশ রান্না ঘরে।

প্রায় সব দেশেই আছে নিজস্ব জাতীয় খাবার শুধু ছিল না ভারতে । প্রতিবেশী পূর্ববঙ্গে জাতীয় খাবার হলো ভাত – সর্ষে ইলিশ, মাছের ঝোল। পাকিস্থানের জাতীয় খাবার নিহারী আর বিরিয়ানি, জাপানের 🍣 সুশি ( ভাতের সঙ্গে মাছ সবজি মিসড), নেপালের ভাত ডাল। কিন্তু ভারতের এতদিন কিছুই ছিল না। 2017 জুলাই থেকে খিচুড়ি এখন queen of Indian food, ভারতের জাতীয় খাবার।

ইতিহাসে খিচুড়ি :
খাবারের রানী খিচুড়িকে গ্রীস দূত ও প্রজ্ঞাবান সেলুকাস ভারতে থাকাকালীন ভারতীয় খাবারের কথা লিখে গেছেন । তিনি লিখেছেন যে সমগ্র ভারতউপমহা দেশে বিশেষ এক স্বাস্থ্য পূর্ণ খাবার তৈরি করে ভারতবাসীরা। যা ছিল সুস্বাদু আর শক্তি বর্ধক। তিনি এটাও জানিয়ে ছিলেন যে এই খিচডি দ্রুত হজম হয়ে যায়।
আনুমানিক 305 খ্রিস্টপূর্বাব্দে আলেকজান্ডার ও তার সেনাপতি সেলুকাস বঙ্গদেশে এসে চাল-ডালের মিশ্রিত প্রস্তুতি দেখে আশ্চর্য হয়ে যান এবং তারা সেই খাদ্য গ্রহণ করেন।

পনেরো শতকে রাশিয়ার পর্যটক নিকিতিন তার গ্রন্হের উল্লেখ করেছেন (Khichdi) খিচুড়ি সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া ও ভারতে এক্ বিশেষ প্রিয় খাবার । প্রায় সব ধরনের মানুষ ধনী-দরিদ্র সবাই এই খাবারটি গ্রহণ করে থাকে।।

চতুর্দশ শতকে ইমন বতুতা ভারতবর্ষে পরিভ্রমণ কালে তিনিও এই বিশেষ খাবারটির প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং তা তিনি তাঁর গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেন। তিনি “কিশরি” বলে উল্লেখ করেছেন। তিনিও এই খাবারের ভুসি প্রশংসা করেন এবং এটি খুব স্বাস্থ্যসম্মত ও সব ধরনের মানুষ এটাকে গ্রহণ করেন খাদ্য হিসাবে সে কথা তিনি উল্লেখ করেছেন।।

ফরাসি পর্যটক তাভেরনিয়েরোঁ লিখেছেন (17 শতকে ) যে চাল ও ডাল এর তৈরি এক বিশেষ ধরনের খবর সমগ্র ভারতউপমহা দেশে অতি জনপ্রিয় । খুবই সহজেই তা তৈরি করা হতো।

*মুঘলদের খিচুড়ি

ভারতের মুঘলরা এই খাবার খুব পছন্দ করতো। আকবরের আত্মজীবনী আইন ই আকবরি তে পাওয়া যায় নবাব আকবর ও তার সভাসদরা নিয়মিত মাংস সহযোগে খিচুড়ী খেতেন এবং সুস্বাদু এবং বলবর্ধক খাবার বলে সৈন্য-সামন্ত দে নিয়মিত খাওয়ানো হতো। এই খিচুড়ির সাথে বিভিন্ন প্রকার মাংস মিশ্রিত করা হতো।

আমরা সবাই জানে যে মুঘলরা প্রচুর পরিমাণে সুগন্ধি মসলা খাবারে ব্যবহার করত। এই খিচুড়ি বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠানের মুঘল সেই সময়কার মুসলমান পরিবার মাংস ও আফগানী সুগন্ধি মশলা দিয়ে খিচুড়ি পরিবেশিত করতো ।
আইন-ই-আকবরীতে উল্লেখ আছে ভারতে প্রায় সাত থেকে আট রকম খিচুড়ির পাওয়া যায় এবং এটি অত্যধিক সুষম আহার খুব তাড়াতাড়ি তৈরি হয় এবং আমির থেকে গরিব থেকে সাধু ফকির সবাই এই খাদ্যটি গ্রহণ করে। আকবর ও পণ্ডিত বীরবল খিচুড়ি ভক্ত ছিলেন । বীরবল নিজস্ব রেসিপিরতে খিচুড়ী তৈরি করতেন ,যা আকবর খুবই পচন্দ করাতেন । আকবরের পুত্র জাহাঙ্গীর ও খিচুড়ি খেতে খুব ভালবাসতেন। মুঘল খিচুড়ি কি কি উপাদান দেওয়া হত তা হল:- অধিক মাংস ও বিভিন্ন ফল যেমন পেস্তা বাদাম, আখরট,কাজু,কিশমিশ । এটাই ছিল মুঘলদের আসলি নবাবী খানা ।
জাহাঙ্গীর তার খিচুড়ী কে বলতেনঃ _lzizn (লজিযান) নবাব জাহাঙ্গীর গুজরাটের ভুট্টা দিয়ে তৈরি তার সাথে বিভিন্ন রকম ডাল মসলা ও মাংস মিশ্রিত এক বিশেষ প্রকার খিচুড়ি খেতেন। আর তার নাতি ঔরঙ্গদেব বলতেন চাল ডাল বিভিন্ন মাসল ও সুগন্ধি মিশ্রিত খিচুরী কে বলতেন *আলমগির খিচুড়ি ।।

পাঠকদের এখানে জানিয়ে রাখি আমি খিচুড়ি নিয়ে চর্চা করার সময় খুব অবাক হয়ে যাই যখন দেখি যে প্রায় দুই হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দে অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর আগে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে বোঝা যায় যে ..সেই সময় এই সমগ্র ভারত তথা আফগানিস্তান বালুচিস্তান পাকিস্থান বাংলাদেশ বর্মা আরাকানা ইন্দোনেশীয় জাভা মালয় সিংহল এই বৃহত্ অঞ্চলে চাল ও ডাল তৈরি করা খাবার প্রচলিত ছিলো ।

ইংরেজদের খিচুড়ি প্রেম

ব্রিটিশ -ভারতে সাহেবদের মন পছন্দ ছিল খিচুড়ি । হ্যাঁ। এটা সত্যি যে ইংরেজরা কলকাতায় বা বাঙ্গালীদের তৈরি খিচুড়ি ভীষণ পছন্দ করত।
বাঙ্গালার খিচুড়ি ব্রিটিশ দের মুখে তৃপ্তি দান করলো বটে কিন্তু খিচুড়ির নাম ঘেঁটে ঘনশ্যাম হয়ে গেল।
সেই এক মজার কাহিনী।
প্রিয় পাঠক যে অনুশীলন করে এটা আমি তৈরি করেছি সেটা কিছুদিন পর দেখব এফবিতে বিভিন্ন নামে কপি-পেস্ট হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে আমার এখানে একটা অনুরোধ যে দয়া করে কপি পেস্ট করবেন না। কারণ মিনিমাম যে চর্চা করতে হয়েছে যে পত্র পত্রিকা এবং বিভিন্ন গ্রন্থ পুরনো দলিল খুঁজে এটা তৈরি করতে হয়েছে সেটার মর্যাদাটুকু যেন থাকে।

আসুন আমরা দেখে নেই কিরকম বাংলার খিচুড়ি ইংরেজদের সকালের খাবার ব্রেকফাস্ট হয়ে উঠলো। মজাদার ঘটনা ।

বাংলার খিচুড়ি আর খিচুড়ি থাকলো না একেবারে জগাখিচুড়ী হয়ে গেল। কিভাবে ? ইংরেজদের বাবুর্চি এরা ছিল তারা অধিকাংশই উড়িয়া ও বাঙ্গালি এই রান্না করার সম্প্রদায়ের মানুষ ব্রিটিশদের উচ্চারণ বুঝতে পারত না আবার বাবুর্চিরা কি ভাষায় বলছে সেটাও ইংরেজ ও স্কটিশ দের বোঝার ক্ষমতার বাইরে ছিল। ফলে খিচুড়ি নাম পরিবর্তন হতে হতে সম্পূর্ণ এক বিদেশি নাম ধারণ করল।
উচ্চারণে khichuri থেকে kidchri হলো। ব্রিটিশরা খ উচ্চারণে না করে ক ও খ এর মধ্য ক্যা উচ্চারণ করতো।
খিচুড়ী হল কিডচড়ি (kidchri)

এবার kidchri থেকে হলো kidgeri (কীদ্গেরী)

কেডগেরি (kedgeri ) অবশেষে kedegeree (কেড্গেরি)

ভাবতে পারেন ছিল রুমাল হয়ে গেল বিড়াল এজন্য সুকুমার রায়ের সেই আবোল তাবোল এর গল্প।
বঙ্গ -খিচুড়ী পেল ব্রিটিশ নাম আর ঢুকে পড়লো সুসজ্জিত ফাইন ডায়নিং টেবিলে । ব্রিটিশ চলে গেছে সঙ্গে গেছে খিচুড়ি ,
আজ ও প্রাতঃরাশে কেডগেরি হাজির হয় সাহেবি খানার টেবিলে ।


হায়দ্রাবাদের নিজাম নবাবদের খিচুড়ি কথা মুঘলদের মতনই হায়দ্রাবাদের নিজাম নবাব খিচুড়ি পছন্দ করত। মুঘলরা তাদের খাবারে মাংস হিসাবে ছাগল,খাসি,ভেড়া ও অধিক মুরগীর খেতেন কিন্তু নিজাম রা মাংস হিসাবে অধিক খাসি বা ছাগলের মাংস খেতেন । দক্ষিণ ভারত অঞ্চলে সেই সময় মুরগির মাংস র প্রচলিত ছিল না ।
হায়দ্রাবাদ নিজামদেরও প্রিয় খাবার ছিল খিচুড়ি ও হালিম , হালিম খিচুড়ির এক্ অন্যরূপ বলা যায় ।খাবার হিসাবে নিজামের হেঁশেলেও জায়গা করে নিয়েছিলো খিচুড়ি। নিজাম খিচুড়ী তে থাকতো মাংসের আধিক্য আর বিভিন্ন নবাবী সুগন্ধী মশলা। নিত্য দিনে, বিশেষ করে রমজান মাসে ইফতার করতে এই খিচুড়ী ছিল এক্ আবশ্যকীয় ডিস ।
খিচুড়ির ইতিবৃত্ত প্রবন্ধ – সমাপ্তি

যে কেউ তাদের লেখা জমা দিতে চান। অনুগ্রহ করে আমাদের লেখা জমা দিন পৃষ্ঠায় জমা দিন| এবং যারা লেখা জমা দিচ্ছেন। পরবর্তী আপডেট পেতে আমাদের ফেসবুক পেজে অনুসরণ করুন।

error: Content is protected !!