কলম পাতুরি

ভাবনা আপনার প্রকাশ করবো আমরা

Home » পুজো সংখ্যা ১৪২৮ » হঠাৎ দেখা

হঠাৎ দেখা

হঠাৎ

চিত্রাঙ্কন: শোভন নস্কর

হঠাৎ দেখা ছোটো গল্প – সুপ্তা আঢ্য

মফস্বল শহর হীরাগঞ্জের বাসস্টপ সকাল থেকে দশটা পর্যন্ত অফিস যাত্রী, স্কুলপড়ুয়াদের ভিড়ে বেশ ভিড় থাকে। এই ভিড়ের মাঝে একজোড়া চোখ খুঁজে চলেছিল আর একজোড়া সুন্দর চোখের অধিকারিণীকে। প্রায় মাস পাঁচেক আগে গাড়ি খারাপ থাকায় এই বাসস্টপ থেকে বাস ধরতে এসে আর্যর চোখ আটকে গেছিল ওই সুন্দর চোখে। তারপর থেকে গাড়িটাকে বাড়িতে রেখে বাসেই যাতায়াত করে সদ্য চাকরি পাওয়া কলেজে – – – – শুধু একবার ওই চোখের তারায় মন হারাবে বলে। এই পাঁচমাস ধরে দেখতে দেখতে কখন যে ওই চোখের অধিকারিণীকে হৃদয় সিংহাসনের রাজেশ্বরী বানিয়ে ফেলেছিল বুঝতেই পারে নি ও। আজকাল ছুটির দিনগুলো কাটতেই চায় না ওর।

    আজ কলেজের অফডে থাকলেও ওই মায়াবী চোখ জোড়া দেখার আশায় নটা থেকেই বাসস্টপে এসে বসে থেকে একটার পর একটা সিগারেট খেয়ে যাচ্ছিল আর্য। প্রায় সাড়ে নটার সময় আর্যর হৃদয়েশ্বরী ওই সুন্দর চোখের অধিকারিণী এই গল্পের নায়িকা সোনালিকা বাসস্টপে এসে দাঁড়াতেই মনের কোণে একঝলক ঠাণ্ডা হাওয়ায় স্নিগ্ধ হয়ে গেল আর্যর মনটা। আজ আর্যর বাস ধরার তাড়া না থাকায় মন ভরে দেখছিল হৃদয়েশ্বরীকে – – – – ভীষণ ইচ্ছে করছিল ওর সাথে দুটো কথা বলার। কিন্তু ওনার ভুবনভরানো রূপ আর মনোলোভা ব্যক্তিত্বের সামনে আর্যর সাহস ফিকে হয়ে যেতেই চুপচাপ দেখে যাচ্ছিল ও। আজ মেঘলা দিনের মেঘছায় রঙের শাড়ি, কালো ব্লাউজ আর মাঝারি সাইজের কালো টিপে অসামান্যা হয়ে উঠেছিল সোনালিকা । ঘাড় অব্দি স্টেপ করে কাটা চুল এলোমেলো হাওয়ায় আজ অবাধ্য। আর্যর ভীষণ ইচ্ছে করছিল আলতো হাতে চোখের ওপর থেকে অবাধ্য চুলগুলো পরম যত্নে সরিয়ে দিয়ে কপালে আলতো চুম্বনের পরশ এঁকে দিতে। ওনার বাসের সময় এগিয়ে আসছিল – – – তাই দেরী না করে হাতের সিগারেটটা ফেলে ধীর পায়ে ওনার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল “এক্সকিউজ মি—-আপনার সাথে একটু কথা বলতে পারি?”

     “আমার সাথে – – – – বলুন!”

   “আপনি কী চাকরি করেন?”

   “হ্যাঁ কেন বলুন তো?”

   “আসলে – – – – আপনাকে রোজই দেখি তো—-তাই জিজ্ঞাসা করছিলাম। কিছু মনে করলেন না তো?

 ” না না – – – – ঠিক আছে – – – – আপনি কী করেন?”

 “আমি আর্য – – – একটা কলেজে পড়াই।”

  “বাঃ এতো বেশ ভালো – – – – আমি অবশ্য স্কুলেই পড়াই।”

   “আমার অসুবিধা নেই”

   “কি বললেন? “

    “না—-মানে – – – – বলছিলাম যে তাতে আর কী হয়েছে। এতে নিশ্চয়ই আপনি আমার বন্ধু হতে অস্বীকার করবেন না। “

   ” বন্ধু – – – আমি – – – – আপনার! আপনি তো বেশ- – – –  আমার কোনো কিছু না জেনেই আমাকে বন্ধু ভেবে নিলেন। “

  ” আপনাকে রোজ দেখছি – – – – সভ্য, ভদ্র, ব্যক্তিত্বময়ী – – – আর কী চাই বলুন তো? আপনাকে বন্ধু ভাবতে আমার কোনো অসুবিধা নেই। “

  ” বেশ—–আমারও অসুবিধা নেই – – – – পরে যদি জানতে পারেন, আমি ঝগড়ুটে – – – – তখন কিন্তু দোষ দিতে পারবেন না। “

  ” পরে যদি জানতেও পারি – – – – – সে দোষটাও না হয় আমি নিলাম। “

   অল্প হেসে সোনালিকা বলল” বেশ তাহলে আমিও আপনার বন্ধু হলাম। “

  ” বন্ধু তো হলেন – – – – আপনার নাম তো জানা হলো না”

  ” ওটা নাহয় পরের জন্য তোলা থাক।”

  একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হতাশের সুরে বলল” বেশ তবে তাই হোক। ফোন নম্বরটা পাওয়া যাবে তো? নাকি – – – “

    অল্প হেসে নিজের ফোন নম্বর দিয়ে আর্যর ফোনের নম্বরটা নিতেই বাসটা এসে গেল সোনালিকার । আর্যকে হাত নেড়ে বাসের পাদানিতে পাটা দিতেই বাসটা ছেড়ে দেওয়ায় সোনালিকা দেখতে পেল না ওর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে আর্য। ওর চোখে ফুটে উঠেছে আত্মবিশ্বাসের আনন্দ।

   ফোনে দুজনের কথা বার্তায়, আড্ডায় বেশ কাটছিল দিনগুলো। আর্য এখন সোনালিকাকে সোনু বলেই ডাকে আর সোনালিকা এতে এতটুকুও অসচ্ছন্দ বোধ করে না। বেশ কিছুদিন ধরেই আর্য ভাবছিল নিজের মনের কথাটা বলবে সোনালিকাকে কিন্তু যতবারই বলতে গেছে এক অজানা দ্বিধায় জিভ সরেনি ওর। বারবার ভেবেছে “ও আমাকে আর পাঁচটা ছেলের মতো হ্যাংলা ভাববে না তো?”

    তবে খুব বেশীদিন অপেক্ষা করতে হলো না আর্যকে। হঠাৎ একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে ছোট্ট কফিশপটায় বসে কফি খেতে খেতে সোনালিকা জিজ্ঞেস করল আর্যকে “তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করলে কিছু মনে করবে না তো?”

    “তোমার কথায় মনে করব – – – এমন স্পর্ধা আমার নেই। বলো কী জানতে চাও।

   ” বেশ কিছুদিন ধরেই ভাবছিলাম বলব- – – – তোমার বিয়েতে আমাকে নিমন্ত্রণ করবে তো?

সোনালিকার এহেন প্রশ্নে প্রায় বিষম খেয়ে মনে মনে আর্য ভাবল” হায় রে, যাকে বিয়ের কনে ভাবলাম – – – – সেই কিনা বিয়ের নেমন্তন্ন খেতে আসবে। কী ভাগ্য আমার! “মনের কথা মনে চেপে রেখে মুখে বলল”তুমি কীকরে নেমন্তন্ন খেতে আসবে”

   “কেন আসতে পারব না – – – – -“

   কথার তোড়ে ভেসে গিয়ে আর্য বলল”বিয়ের কনে কী নিজের বিয়ের নেমন্তন্ন খেতে আসে?

   “মানে? আমি কেন বিয়ের কনে হতে যাব?”

  “তাহলে কে হবে? আমার বিয়ে তো তোমার সাথেই হবে। “

একটু গম্ভীর মুখে সোনালিকা বলল”তুমি ভুল ভাবছ আর্য – – – বিয়ে করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। “

  ” ও – – – তুমি বুঝি অন্য কাউকে ভালোবাসো! কে সেই ভাগ্যবান জানতে পারি “

   “কেউ না—–আমি কাউকেই ভালোবাসি না।” মুখে একথা বললেও মনে মনে বলল ” আমার জীবনে তুমি ছাড়া আর কেউ নেই আর্য – – – – – কিন্তু সেকথা শুধুমাত্র আমার মনেই থাকুক। “

  ” তাহলে আমার কনে হতে আপত্তি কোথায় সোনু? “

 ” ওই যে বললাম, ডিসিশনটা নিয়ে নিয়েছি বিয়ে না করার।”

” এরকম ভীষ্মের পণ করলে কেন ? “

 “এমনিই – – – – আসলে বিয়ে জিনিসটা বড়ো ঝামেলার – – – অন্যের সংসারে অন্যের মতো করে থাকা—–নিজের বাড়িতে পর হয়ে যাওয়ার কষ্ট—–ও আমি মানতে পারব না। তাই বিয়েটা এজীবনে করা হবে না আর্য”

   সোনালিকার কথাগুলো পুরোনো হলেও বড্ড সত্যি হওয়ায় চট করে কোনো উত্তর জোগালো না আর্যর। তবে ওর মনে অন্য কেউ নেই জেনে বড়ো শান্তি পেল আর্য।তবে হাল ছাড়তে নারাজ আর্য মনে মনে ঠিক করল” বিয়ের কনের পিঁড়িতে তোমাকেই বসাব সোনু—-এটা আমার চ্যালেঞ্জ।” মুখে বলল “এসবের মধ্যে আবার আমার বন্ধুত্বকে অস্বীকার করবে না তো”

   “আমাকে কী তোমার সেরকম মনে হয় আর্য? জানো আর্য – – – – – তুমি আমার খুব ভালো বন্ধু। তোমার মতো বন্ধুকে কোনো মূল্যেই হারাতে চাই না। তুমি আমার বন্ধু থাকবে তো? “

  প্রসঙ্গ পাল্টাতে আর্য বলে উঠল “তোমার কফিটা যে ঠাণ্ডা হয়ে যাবে – – “

   আর্যর কথায় লজ্জা পেয়ে সোনালিকা তাড়াতাড়ি কফি শেষ করে ওকে গুডবাই জানিয়ে বাড়ির পথে রওনা দিল।

   আজ আর আর্য ওর সাথে আসেনি। বেচারা ওর প্রত্যাখ্যানে বেশ কষ্টই পেয়েছে। কিন্তু ওরও যে কিছু করার নেই। শুধুমাত্র কারোর হাত থেকে সিঁদুর পড়লেই বাবা মা কে ছেড়ে চলে যেতে হবে – – – – এটা কিছুতেই মানতে পারবে না বলেই চাকরী করে একা থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ও। তবে আর্যর সাথে মেশার পর থেকেই অন্য একটা অনুভূতি তৈরী হয়েছে ওর মনে——যে অনুভূতি না প্রকাশের কষ্ট ওকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। কিন্তু নিজের জেদের কাছে হার মানবে না বলেই মনের রাশ আলগা হতে দেয়নি সোনালিকা।

     সোনালিকা ফিরে যেতেই আর্যও নিজের মতো করে বাড়ি ফেরার সময় দেখে পশ্চিম আকাশ কালো হয়ে এসেছে মেঘের ছায়ায় – – – – গাছেরা তোড়জোড় শুরু করছে নটরাজ নৃত্যের – – – – পাখিরা আভাস পেয়ে দ্রুত ফিরছে কুলায় – – – – আশেপাশের মানুষজনও যে যার মতো সেদিনের পসরা গুটিয়ে বাড়ির পথ ধরছে। ব্যতিক্রম শুধুই আর্য – – – – – আজ এই মনকেমন করা পরিবেশে ওর ইচ্ছে করছিল উথাল পাথাল হাওয়ায় নিজেকে সঁপে দিতে।সেই আশায় তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে ছাদে গিয়ে ঝড়ের মুখে চুপটি করে দাঁড়িয়ে পড়ল ও——ঘন মেঘের বজ্রগম্ভীর স্বরের তালে প্রকৃতির তাণ্ডব নৃত্যের মাঝে মাঝে খাপ খোলা তরোয়ালের মতো চোখ ধাঁধানো বিদ্যুতের ঝলকানিতে মনের সব কালো কেটে গিয়ে আকাশের ঘন কালো রঙের মাঝে এক হয়ে যাচ্ছিল। সোনালিকা মুখটা বড্ড মনে পড়ছিল ওর। আজ কফিশপে ভীষণ ইচ্ছে করছিল সোনুর নরম পাতলা আঙুলগুলো আলতো ছোঁয়ায় ছুঁয়ে যেতে, টেবিলের নীচে আলগোছে ফেলে রাখা পায়ের পাতায় নিজের পুরুষালি পায়ের পাতা ডোবাতে। সোনুর বলা কথাগুলো বড্ড দাগ কেটে যাচ্ছিল ওর মনে – – – – কীকরে ওর মনের গভীরে প্রবেশ করে ওর নরম নারী হৃদয়কে উথাল পাথাল করবে ভেবে পাচ্ছিল না আর্য।

   ঝড়ের শেষে সবধোয়া বৃষ্টিতে কাকভেজা ভিজে যখন ও নীচে এল – – – তখন ফোনটা বেজেই চলেছে ক্লান্তিহীন ভাবে। ফোনটা ধরতেই অপর প্রান্তের কণ্ঠটি এক জরুরী নির্দেশ দিয়ে রেখে দিল ফোনটা। কোনওরকমে ভিজে জামাকাপড় পাল্টে ফোনে আসা নির্দেশানুযায়ী পরদিন সকালে দিল্লি যাবার তোড়জোড় শুরু করে দিল ।

    বেশ কিছুদিন বাসস্টপে আর্যকে দেখতে না পেয়ে একটু খারাপ লাগছিল সোনালিকার। ফোনে সবটা শুনলেও মন মানছিল না ওর—–বড্ড মিস করছিল ওকে ।আজকাল বাসস্টপে এসেই চোখ চলে যায় উল্টোদিকের চায়ের দোকানের সামনের নির্দিষ্ট জায়গাটায়। এখন ওই জায়গায় অন্য কাউকে সহ্য ই করতে পারে না ও। জানা সত্ত্বেও ঘড়ির কাঁটা সাড়ে নটার ঘর ছুঁলেই চোখটা আপনা থেকেই খুঁজে ফেরে আর্যকে – – – – – কিছুক্ষণ পর চোখদুটো ভারাক্রান্ত হয়ে যায় প্রিয় মানুষটাকে দেখতে না পেয়ে।স্কুল যাওয়া আর বাড়ি ফেরা ছাড়া বাকী সময়টা কাটতেই চায়না আর্যকে ছাড়া। আর্য এখন ভীষণই ব্যস্ত – – – – সারাদিনে একবারের বেশি ফোন করার সময়ই পায়না।। ওর সাথে কথায় কথায় সময়ের ব্যবধান খেয়ালই থাকত না ওর।

     হঠাৎই একদিন স্কুল থেকে ফিরে দরজার বেলটা বাজতেই যে দরজাটা খুলল তাকে দেখে আনন্দে, খুশীতে বাক্যহারা হয়ে গেল ও”দাদা – – – – তুই!”

     “হ্যাঁ রে, কদিনের ছুটি পেলাম তাই তোদের দেখতে বাড়ি চলে এলাম।”

     “কদিন থাকবি তুই?”

     “এই – – – দিন কুড়ি আছি আমি।” এরপর মায়ের দিকে ঘুরে বলল”মা, এবার সোনার বিয়েটা দিয়ে তবে ফিরব।”

    “ছেলে বুঝি তোর হাতের মুঠোয় ধরা আছে?

     “আমার এক বন্ধুর তোর ছবি দেখে ভীষণই পছন্দ হয়েছে। কাল ওকে বাড়িতে আসতে বলেছি।”

   ” আমাকে না জিজ্ঞেস করেই আসতে বলে দিলি দাদা?

 ” তোর দাদা হিসেবে যা ভালো মনে করেছি – – – – সেটাই করেছি। “

” আমি সেটা বলিনি – – – – কিন্তু আমি তো বিয়ে করব না দাদাভাই! “

 ” দেখ সোনা, অনেক ছেলেমানুষী করেছিস—-বিয়ে করে সব মেয়েরাই অন্যের বাড়ি যায়। এটাই আমাদের প্রথা।মাও তো এসেছে—-এসব চিন্তা ছেড়ে বিয়েতে রাজি হয়ে যা। লক্ষ্মী বোন আমার”

   “কিন্তু – – – – তোদের ছেড়ে যে চলে যেতে হবে—-সে আমি পারব না।”

  “আমাদেরও কষ্ট হবে। কিন্তু তুই তোর ভালবাসার মানুষের সাথে সুখে শান্তিতে থাকবি—-আনন্দে নিজের সংসারে রাজরানী হবি—-এতেই আমরা আনন্দে থাকব। তুই আর অমত করিস না।”

   “যে আসবে তাকে যদি পছন্দ না হয়?”

   “না হলে অন্য পাত্র খোঁজ করব – – – – আর তোর যদি কোনো পছন্দের থাকে তো বলিস। “

  এই মুহূর্তে আর্যর কথা বলতে গিয়েও কিছু একটা ভেবে চুপ করে গেল ও।” শুধু শুধু এখনই কিছু বলে লাভ নেই। দাদার বন্ধু যখন ধীরে সুস্থে বারণ করলেই চলবে”নিজের মনে এসব ভাবতে ভাবতে নিজের ঘরের জানালার সামনে দাঁড়াতেই আর্যর মুখটা ভেসে উঠল চোখের সামনে—–ক্লিন শেভড, ব্যাকব্রাশ করা চুলের মাঝে ফর্সা মুখটা বড্ড মনে পড়ছিল ওর। মাঝে মাঝেই ওর প্রাণখোলা হাসিটা কানে অনুরণিত হচ্ছিল ওর।অমাবস্যার গহ্বর থেকে বেরোনোর পরের একফালি চাঁদটাকেও আজ ম্লান মনে হচ্ছিল ওর—-আর্যর অভাব বড়ো বেশি মনে হচ্ছে ওর। বেশকিছুক্ষণ জানালার বাইরে আঁধারের রঙে রাঙানো কালো আকাশের বুকে একফালি চাঁদের দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে ওর আবছা আলোয় আর্যর মুখচ্ছবি মনের মধ্যে এঁকে নিজের বিছানায় চলে এল সোনালিকা।

    পরদিন সকাল থেকেই বাড়িতে ভীষণ ব্যস্ততা। মা আর দাদার বসার ফুরসতই নেই। ওকে আজ কোনো কাজেই হাত দিতে দেওয়া হচ্ছে না – – – – দাদা বারবার বাজারে যাচ্ছে আর মা সকাল থেকে পুরো বাড়ি মাজাঘষা করে প্রায় নতুন করে তুলে দুপুর থেকে রান্নাঘরে ঢুকে মনের মতো রান্নায় ব্যস্ত ।দাদার বন্ধুটি নাকি একাই আসছে—-কোনো কিছু খাবেও না। তাও যে কেন এত তোড়জোড় মাথায় ঢুকছে না ওর।

  আজ সকাল থেকে আর্যর ফোনটাও সুইচড অফ শোনাচ্ছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও বারবার চেষ্টা করে যাচ্ছে সোনালিকা – – – – ও ঠিক করে নিয়েছে মনের কথাটা আর্যকে জানাবেই। আর ওকে দূরে সরিয়ে রাখবে না। আর আজ রাতেই দাদার বন্ধুকে না করে দেবে। ওর দৃঢ় বিশ্বাস – – – – দাদাভাই ওকে নিশ্চয়ই বুঝবে। মা আর দাদার তাগাদায় অনিচ্ছা সত্ত্বেও কাঁচা হলুদ জমিতে শ্যাওলা সবুজ রঙের ছোট্ট ছোট্ট ময়ূরের ছবি আঁকা পিওর সিল্কটা পরে ওদের ডাকে নীচে নেমে এসে বসার ঘরে ঢুকে আর্যকে দেখে চমকে উঠল সোনালিকা। “আয় সোনা – – – আমার বন্ধু আর্যর সাথে তোকে পরিচয় করিয়ে দি।”

   চোখের সামনে আর্যকে দেখে বুকের মধ্যে দ্রিমিদ্রিমি রবে কী যেন বাজছিল সোনালিকার। মুখে কিছু না বলে একরাশ রাগে অভিমানে অপরিচিতের মতো হাত জোড় করে নমস্কার করে মুখ নীচু করে সোফায় বসে রইল। আর ময়ূর আঁকা হলুদ শাড়ি, খোলা চুল, চোখের কালো কাজল, কপালের শ্যাওলা সবুজ রঙের টিপ আর ডান হাতের রিস্টে গোল্ডেন ব্যান্ডের ঘড়িতে অতুলনীয়া সোনালিকাকে দেখে চোখ সরাতে পারছিল না আর্য। রণিতের কথায় চমক ভেঙে সোনালিকাকে এড়িয়ে থাকতে ওদের সাথেই গল্পে মেতে উঠল আর্য।

    বিয়ের সম্বন্ধে সোনার কোনো আপত্তিই ধোপে টিকলো না – – – – অবশ্য দাদার পছন্দ আর নিজের পছন্দ মিলে যাওয়ায় আপত্তি জোরদারও হয় নি খুব একটা। রণিতের চলে যাওয়ার আগে বোনের বিয়েটা সম্পন্ন করার ইচ্ছেটাকে মূল্য দিতে একমাসের মধ্যে বিয়েতে মত দিয়েছে আর্য। এই কটাদিন বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত আর্য ইচ্ছে করেই আরো ব্যস্ত থাকছিল সোনালিকার মুখোমুখি হবে না বলে।

  আমাদের নায়িকা সোনালিকাও বড়ো অভিমানী – – – – আর্য  এড়িয়ে চলছিল বুঝতে পেরে ও আর ফোন করেনি ওকে। বাসস্টপেও আজকাল দেখাই যায় না আর্যকে । দাদা আর মায়ের কথাবার্তায় শুনেছে, ও নাকি এখন বড়ো ব্যস্ত। তাই ব্যস্ত মানুষকে বিব্রত করতে চায়নি বলেই আর ফোন করেনি আর্যকে—শুধু অপেক্ষায় আছে ওর ব্যস্ততার শেষের দিনের।

   দেখতে দেখতে ওদের বিয়ের দিনটা এসেই গেল। সকাল থেকেই সোনালিকার বাড়িতে ভীষণই ব্যস্ততা – – – – রণিতের কোনও ফুরসতই নেই। যতই হোক – – – ভীষণ আদরের একমাত্র বোনের বিয়ে বলে কথা। আজ লাল বেনারসীতে কনের সাজে সজ্জিতা সোনালিকাকে দেখে চোখ সরানো যাচ্ছে না —–বন্ধুদের কাছে সোনুর রূপ বর্ণনা শুনে  মহারানীকে দেখার আশায় ছটফট করলেও সেকথা চেপে রেখে চুপচাপ বসে রইল আর্য। শুভদৃষ্টির সময় পানপাতার আড়াল থেকে যে মুখটা দেখা গেল – – – – তার দিকে স্থান কাল ভুলে অপলকে তাকিয়ে রইল ও।অভিমানী সোনালিকা অবশ্য একবার নিয়মরক্ষার খাতিরে তাকিয়েই নামিয়ে নিয়েছিল মুখটা ।ওর অভিমানের গভীরতা বুঝে একটু ভয় পেলেও বেশ উপভোগ করছিল ও ব্যাপারটা।

  শুভদৃষ্টি, সিঁদুর দান পেরিয়ে বিয়ে মিটলেও সোনালিকাকে এড়িয়েই চলছিল আর্য।বাসর শয্যাতেও স্ত্রীর সাথে কোনো কথা না বলে জোর করে ঘুমিয়ে পড়তেই সোনালিকার অভিমান আরও তীব্র হয়ে উঠল। পরের দুটো দিন বিভিন্ন ব্যস্ততার অজুহাতে স্ত্রীকে এড়িয়েই চলছিল ও। স্বামীর এরকম অদ্ভূত ব্যবহারে আহত সোনালিকার বুকের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছিল। এই মনখারাপের কথা কাউকে বলতে না পেরে মনে মনে ভেঙেচুরে যাচ্ছিল ও ।আর্য এসব দেখেও না দেখার ভান করে ভালোই কাটাচ্ছিল।

    বউভাতের দুপুরে সোনালিকার এই মানসিক অবস্থায় একটুও সাজতে ইচ্ছে করছিল না। চোখের সামনে আর্যকে সকলের সাথে হাসিঠাট্টায় মেতে থাকতে দেখে নিজেকে বড্ড অবহেলিত মনে হচ্ছিল ওর। ভীষণই রাগ হচ্ছিল দাদার ওপরে। ওর মুখের করুণ অবস্থা আর কারো চোখে না পড়লেও দৃষ্টি এড়ায়নি আর্যর। ওর আড়ালে মেকআপ আর্টিস্ট মণীষাকে বলল”দেখবেন ম্যাডাম, ওর আজকের রূপ যেন আমি কখনও ভুলতে না পারি।”

   “আপনি চিন্তা করবেন না স্যার। আপনার সুন্দরী স্ত্রীকে আরও সুন্দর করে তোলার দায়িত্ব আমার। আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন।”

     প্রতিটা মেয়েকেই বিয়ের সময় কনের সাজে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুন্দরী মনে হয় – – – আর কনে যদি আমাদের নায়িকার মতো সুন্দরী হয়, তাহলে তো আর কথাই নেই। প্রায় ঘণ্টা তিনেকের সাজসজ্জার পর  দরজা খুলে কনের সাজে সজ্জিতা হয়ে সিঁথি ভরানো সিঁদুর আর আগুনরঙা বেনারসী পরে লজ্জার লালিমায় আরও সুন্দরী হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে বাইরে পা রাখতেই সকলের চোখ আটকে গেল ওর উপর। আর্যর চোখ তো সরতেই চাইছিল না – – – – – নবপরিণীতা স্ত্রীর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে দেখে বাড়ির সকলে হেসে উঠতেই লজ্জায় পালিয়ে বাঁচল আর্য আর সোনালিকা স্বামীর এই অদ্ভূত ব্যবহারে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল ওর চলে যাওয়া পথের দিকে।

   বিয়েবাড়ির সব কাজ মিটলে ফুলে সাজানো ঘরটায় ঢুকে দেখল জানালার সামনে উদাস চোখে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে সোনালিকা। গত কয়েকদিনের ব্যবহারে ও যে ভীষণ কষ্ট পেয়েছে তা বুঝতে বাকী রইল না আর্যর। ধীর পায়ে ওর কাছে এগিয়ে পিঠে হাত রাখতেই চমকে উঠে তাকাতেই আর্য দেখল সোনালিকার কাজল কালো চোখ দুটো জলে ভরে গেছে।

   “কী হয়েছে সোনু – – – চোখে জল কেন?”

   “কিছু না—–কিছু বলবে?”

   “আমার ব্যবহারে কষ্ট পেয়েছ না?” স্বামীর মমতামাখা গলার স্বরে চোখের জল বাঁধ না মেনে নরম গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়তেই পরম যত্নে তা মুছিয়ে দিয়ে স্ত্রীকে বুকের মাঝে জড়িয়ে নিয়ে বলল”আজকের পর থেকে সবরাতগুলো তোমার সাথে কাটানোর জন্যই তো এত আয়োজন, ডার্লিং ।”

     অশ্রুভেজা কণ্ঠে স্বামীর বুকের মধ্যে থেকে মুখ না তুলেই বলে উঠল “তাহলে এই কদিন এরকম কেন করলে বলো?”

   “আজ তোমার সব প্রশ্নের উত্তর দেব বলে।”

   “বলো কী বলবে”

  ধীরে ধীরে স্ত্রীর মুখটা দুহাতের পাতায় ধরে সিঁথিতে, কপালে, দুচোখের পাতায় নিজের ঠোঁট ছোঁয়াতেই এক অন্যরকম আবেশে থরথর করে কেঁপে উঠে আর্যর পিঠটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরতেই ওর নরম পেলব ঠোঁটে নিজের পুরুষালি ঠোঁট ডুবিয়ে পরম আবেশে অধরসুধা পান করতে লাগল আর্য। ধীরে ধীরে পরম আবেশে একে অপরের শরীরে মিশে এক অনাস্বাদিত শরীরি ঘ্রাণের সুবাশে আবিষ্ট হয়ে দুজন দুজনকে তীব্র আশ্লেষে জড়িয়ে ধরে একাত্মা হয়ে গেল।

  ওদিকে  তখন শেষ রাতের সানাইয়ের সুরে সুর মিলিয়েছে মিলনপিয়াসী দুটি হৃদয়ের সুর আর জানালার গরাদের ফাঁক দিয়ে সেই দৃশ্য দেখে পরিতৃপ্তির হাসি হেসে আকাশের বুকে লজ্জায় মুখ লুকিয়ছে চতুর্দশীর চাঁদ।

হঠাৎ দেখা ছোটো গল্প – সমাপ্তি

যে কেউ তাদের লেখা জমা দিতে চান। অনুগ্রহ করে আমাদের লেখা জমা দিন পৃষ্ঠায় জমা দিন এবং যারা লেখা জমা দিচ্ছেন। পরবর্তী আপডেট পেতে আমাদের ফেসবুক পেজে অনুসরণ করুন।

error: Content is protected !!